বুকে প্রচন্ড ভালোবাসা নিয়েও মুখে প্রকাশ করতে না পারার স্বভাব আমি আমার বাবার কাছ থেকেই পাওয়া। হৃদয়ভর্তি ভালোবাসা থাকা সত্তেও কখনো বাবার গলা জড়িয়ে বলা হয়নি "বাবা তোমায় অনেক ভালোবাসি "।
বাবা অনেক কষ্ট করেছেন আমাদের জন্য। আমাদের হাসি খুশি রাখার জন্য সবসময় চেষ্টা করেছেন আজীবন। কিন্তু সেই তিনি যখন অসুস্থ ও নিঃসঙ্গ হয়ে বছরের পর বছর বিছানায় কাটিয়ে দিয়েছেন। তখন আমি আমার বাবার সাথে একটু গল্প করার সময়ও ঐভাবে দিতে পারিনি শুধু ব্যাস্ততা ও নিজ পরিবারের জন্য। দুরে থাকলেও কখনো বাবার প্রতি আমার দায়িত্ব, কর্তব্যে আমি অবহেলা করিনি।গল্প জমা করতাম, তার সাথে করবো বলে। কিন্তু সময় টা খুবই কম হতো।আসার সময় বারবার বাবা কান্না করতো,আর বলতো বাবা আবার কবে আসবে? উত্তরে আমি বলতাম,বাবা সময় পেলেই আমি ছুটে আসবো।
গতকাল ইফতারের পর যখন আমার মেয়েরা ঈদের চাঁদ উঠেছে কিনা সেটা দেখার জন্য অস্থির ঠিক তখনি আমার মোবাইলে কল আসলো।বাবা লেখা সেই নাম্বার থেকে ফোন আসে।আমি এক মুহূর্তের জন্য ভাবতে থাকলাম এই বুঝি বাবা জানতে চাইলো , বাবা তোমার কিছু লাগবে? যদিও ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আর কোনদিন বাবার কন্ঠ শোনা যাবে না। তবুও হঠাৎ করেই মনের অজান্তে বলে উঠলাম ,বাবা !
কিন্তু বাবার সাথে আর গল্প বা কথা বলা হলোনা।
আমার এমন অবস্থা দেখে মা নিরবতা ভেঙে বললেন-কেমন আছিস বাবা? এদিকে প্রত্যেকটি শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে , চোখ ফেটে আমার পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠেছিল একের পর এক ছোটোবেলার ঈদের স্মৃতি !
প্রত্যেক দশ রমজান থেকে শুরু করে একদম ঈদের আগপর্যন্ত ,বাবা ঘরে ফিরলেই উনার হাতের দিকে গোপন আর লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকাতাম ৷
কবে আসবে আমার নতুন জামা,জুতো, মেহেদী ইত্যাদি। ভুলবশত কোন কিছু বাদ পড়লে বাবার মাথা খারাপ করে ফেলা আর রাতভর কান্না, মান অভিমান।
আমি এখনো প্রত্যাশা করি,কল্পনায় আমার ছেলে বেলাকে বার বার সাজাই।এই বুঝি আমার ঈদের নতুন যাবতীয় জিনিস নিয়ে বাবা হাজির হবেন ! আর বাবা ঈদের নামাজ শেষ করে আসলে, আমি আর বাবা হাতে হাত রেখে আমাদের ছোট্ট বাজারটাতে ঘুরে বেড়াবো।বাবা আমার পছন্দের সবকিছু কিনে দিবেন। যেমন টি আমি পছন্দ করি ছোট ছোট চকলেট, বাদামভাজা,বুট ভাজা,আংগুলি,খাজা আর রং বেরঙের আইসক্রিম। বারবার এই বাবা সমেত ছোট্টবেলার ঈদটা ভাবতে ভালোই লাগে। যদিও আর কোন দিন তা ফিরে পাবোনা।
আমার বাবা পরপারে ভালো থাকুক। প্রতিবার প্রার্থনায় আল্লাহকে বলি তিনি আমার বাবার দুনিয়াবী ভুল-ভ্রান্তি মার্জনা করে যেন উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।

No comments:
Post a Comment